বাংলাদেশে পান চাষ একটি ঐতিহ্যবাহী ও লাভজনক কৃষি খাত। কিন্তু অনেক সময় পান চাষিরা একটি সাধারণ সমস্যার সম্মুখীন হন—পান পাতার নিচে স্বচ্ছ স্ফটিক জাতীয় দানা দেখা যায় যা পরে কালো হয়ে যায়। অনেকে এটিকে পানের চিনি পোকা বলে আবার অনেকে এটি পোকামাকড় বা রোগের লক্ষণ ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো রোগ বা পোকা নয়, বরং গাছের এক প্রাকৃতিক নিঃসরণের ফল।
পানের চিনি পোকা
কী এই স্ফটিক বা দানা?
পান গাছ ‘Piper’ গোত্রভুক্ত। এই গাছের পাতার নিচে মাঝে মাঝে ছোট ছোট সাদা, স্বচ্ছ দানা দেখা যায় যা পরবর্তীতে কালো হযে যায়। এগুলোকে Exudate Crystals (নিঃসৃত স্ফটিক) বলা হয়। গাছ যখন তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত চিনি (শর্করা) তৈরি করে, তখন তা পাতার নিচের ছোট রন্ধ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে এবং পাতার গায়ে জমে। সূর্যের আলো ও বাতাসে এগুলো শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। যার পেছনে রয়েছে একটি জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া। নিচে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করছি:
১. এক্সুডেট কীভাবে তৈরি হয়?
গাছ যখন অতিরিক্ত শর্করা (sugar) উৎপন্ন করে এবং তা ব্যবহারের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন সেই অতিরিক্ত শর্করা পাতার নিচের রন্ধ্র (stomata বা হাইডাথোড) দিয়ে নিঃসরণ হয়ে আসে। এই নিঃসরণ শুকিয়ে গিয়ে স্বচ্ছ বা সাদা স্ফটিক আকার ধারণ করে। একে এক্সুডেট বলে।
২. স্ফটিক থেকে কালো দাগে রূপান্তর কেন হয়?
এর প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
(ক) অক্সিডেশন (Oxidation):
স্ফটিকগুলো মূলত গ্লুকোজ বা অন্য চিনিজাত পদার্থের তৈরি। যখন এগুলো বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন ধীরে ধীরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে কালচে রঙ ধারণ করে। এটি এক ধরনের অক্সিডেশন রিঅ্যাকশন।
(খ) ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের ক্রিয়া:
চিনিজাত পদার্থ হওয়ায় এগুলো ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের খাদ্য হিসেবে কাজ করে। এই মাইক্রোবায়াল ক্রিয়ায় স্ফটিকগুলো কালো হয়ে যায় এবং পাতায় দাগের সৃষ্টি হয়।
(গ) ক্যালসিয়াম অক্সালেট জমা:
অনেক সময় এক্সুডেটের উপাদান ক্যালসিয়াম অক্সালেটে রূপ নেয়, যা প্রাকৃতিকভাবে ধীরে ধীরে কালচে বা ধূসর দাগে পরিণত হয়।
এটা কি ক্ষতিকর?
না, সাধারণত এটি ক্ষতিকর নয়। এটি গাছের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা প্রক্রিয়া এবং পিঁপড়ার মতো উপকারী পোকা আকৃষ্ট করার কৌশল। তবে যদি অতিরিক্ত পরিমাণে হয় এবং শুকিয়ে কালচে দাগে পরিণত হয় তাহলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের আক্রমন হতে পারে। পাশাপাশি গাছের পাতা দেখতে দাগযুক্ত ও বিবর্ণ হয়ে পড়ে। এতে পাতার কোয়ালিটি নষ্ট হয় এবং বাজারে চাহিদা কমে যায়।
পান বরজে এক্সুডেট স্ফটিক বেশি হওয়ার কারণ:
১. অতিরিক্ত আলো প্রবেশ:
বরজে যদি ছাউনি পাতলা হয় বা ছাঁয়ার পরিমাণ কমে যায় অর্থাৎ অতিরিক্ত আলো ঢুকে পড়ে। এর ফলে শালোকসংশ্লেষন বেশি হয় এবং গাছ বেশি শর্করা তৈরি করে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত শর্করা পাতার নিচ দিয়ে নিঃসৃত হয়ে স্ফটিক ও পরে কালো দাগে পরিণত হয়।
২. আর্দ্রতার ভারসাম্যহীনতা:
পান গাছ আর্দ্রতা পছন্দ করে, কিন্তু অতিরিক্ত ভেজা বা অতিরিক্ত শুকনা—দুটোই ক্ষতিকর। মাটিতে অথবা বাতাসে আর্দ্রতা কমে গেলে পাতায় স্ট্রেস তৈরি হয় এবং এক্সুডেট নিঃসরণ বাড়ে।
৩. নাইট্রোজেন ও অন্যান্য সার:
অতিরিক্ত নাইট্রোজেন বা অনুপযুক্ত সার ব্যবহারে উদ্ভিদের স্বাভাবিক হরমোন ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে বেশি শর্করা তৈরি হয়।
সমাধান ও প্রতিকার (বরজ ব্যবস্থাপনা):
১. ছাউনির ঘনত্ব ঠিক করুন। ছাউনির উপরে ৫০%-৬০% ছায়া নিশ্চিত করুন। প্রয়োজন হলে শুকনো খড় কিংবা শেড নেট (shade net) ব্যবহার করুন।
২. আলো পর্যবেক্ষণ করুন বরজে এমনভাবে ছায়া দিন যাতে দিনে ৬-৮ ঘণ্টা আলো সরাসরি প্রবেশ না করে।
৩. মাটি ও বাতাসের আর্দ্রতা ঠিক রাখুন। মাটি সবসময় স্যাঁতসেঁতে রাখুন, কিন্তু জলাবদ্ধ নয়।
৪. সুষম সার ব্যবহার করুন। অতি নাইট্রোজেন এড়িয়ে চলুন। ভারসাম্যপূর্ণ NPK ব্যবহার করুন। জৈব সার ব্যবহারে উপকার পাবেন।
2 thoughts on “পানের চিনি পোকা বা পান পাতায় স্বচ্ছ দানা”
Johourul Islam Masum
বিষয়: পানের বরজে অজ্ঞাত স্ফটিক দানার আক্রমণ ও ক্ষতির বিষয়ে মতামত প্রদান।
আমি মোঃ জহুরুল ইসলাম মাসুম, ৭ম পর্বের শিক্ষার্থী, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা। আমার বাড়ি রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলায়। আমাদের এলাকায় এবং নিজস্ব পানের বরজে অনেকদিন যাবৎ এক ধরনের স্বচ্ছ স্ফটিক আকারের দানার আক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের পান ফসলে ব্যাপক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
এই দানাগুলো পুরাতন ও নতুন উভয় ধরনের পাতাতে আক্রমণ করছে—পাতার উপর, নিচ, চারপাশে কোথাও বাদ যাচ্ছে না। এই আক্রমণে পাতা মরিচা পড়ার মতো দেখাই , বিবর্ণ হয়ে পড়ে ছোট ছোট আলপিনের ফোটার মতো দাগ দেখা যাই এবং ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ বরজ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এমনকি চালে ছাউনি দিয়ে আলো নিয়ন্ত্রণ করলেও এদের প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
আপনার লেখা একটি আর্টিকেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরনের স্ফটিক দানাগুলো ক্ষতিকর নয়। তবে আমি মাঠ পর্যায়ে যেভাবে এর ক্ষতিকর প্রভাব দেখছি, তা থেকে মনে হচ্ছে এটি মোটেই অবহেলা করার মতো নয়। বিভিন্ন কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
সম্প্রতি আমি এই স্ফটিক দানার নমুনা বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলাম। তারা জানিয়েছেন যে এটি রেড মাইট (Red Mite) বা লাল মাকড়সার আক্রমণের ফল হতে পারে। তারা এবামেকটিন গ্রুপের কিটনাশক প্রয়োগ করতে বলেছেন । আপনি বলছেন এটা পোকা বা রোগ নয় ।
এই পরিস্থিতিতে আমি দ্বিধায় পড়ে গেছি—এই দানাগুলো আসলে কী? এরা ক্ষতিকর কিনা, এর প্রতিকার কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণ এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। আশা করি আপনি আমাকে এ বিষয়ে একটি সঠিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করবেন।
আপনার সদয় সহযোগিতা ও সঠিক দিকনির্দেশনার প্রত্যাশায় রইলাম।
বিষয়: পানের বরজে অজ্ঞাত স্ফটিক দানার আক্রমণ ও ক্ষতির বিষয়ে মতামত প্রদান।
আমি মোঃ জহুরুল ইসলাম মাসুম, ৭ম পর্বের শিক্ষার্থী, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা। আমার বাড়ি রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলায়। আমাদের এলাকায় এবং নিজস্ব পানের বরজে অনেকদিন যাবৎ এক ধরনের স্বচ্ছ স্ফটিক আকারের দানার আক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের পান ফসলে ব্যাপক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
এই দানাগুলো পুরাতন ও নতুন উভয় ধরনের পাতাতে আক্রমণ করছে—পাতার উপর, নিচ, চারপাশে কোথাও বাদ যাচ্ছে না। এই আক্রমণে পাতা মরিচা পড়ার মতো দেখাই , বিবর্ণ হয়ে পড়ে ছোট ছোট আলপিনের ফোটার মতো দাগ দেখা যাই এবং ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ বরজ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এমনকি চালে ছাউনি দিয়ে আলো নিয়ন্ত্রণ করলেও এদের প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
আপনার লেখা একটি আর্টিকেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরনের স্ফটিক দানাগুলো ক্ষতিকর নয়। তবে আমি মাঠ পর্যায়ে যেভাবে এর ক্ষতিকর প্রভাব দেখছি, তা থেকে মনে হচ্ছে এটি মোটেই অবহেলা করার মতো নয়। বিভিন্ন কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
সম্প্রতি আমি এই স্ফটিক দানার নমুনা বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলাম। তারা জানিয়েছেন যে এটি রেড মাইট (Red Mite) বা লাল মাকড়সার আক্রমণের ফল হতে পারে। তারা এবামেকটিন গ্রুপের কিটনাশক প্রয়োগ করতে বলেছেন । আপনি বলছেন এটা পোকা বা রোগ নয় ।
এই পরিস্থিতিতে আমি দ্বিধায় পড়ে গেছি—এই দানাগুলো আসলে কী? এরা ক্ষতিকর কিনা, এর প্রতিকার কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণ এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। আশা করি আপনি আমাকে এ বিষয়ে একটি সঠিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করবেন।
আপনার সদয় সহযোগিতা ও সঠিক দিকনির্দেশনার প্রত্যাশায় রইলাম।
ধন্যবাদান্তে,
মোঃ জহুরুল ইসলাম মাসুম
শিক্ষার্থী, ৭ম পর্ব
কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা
স্থায়ী ঠিকানা: মোহনপুর, রাজশাহী
সঠিক তথ্যের অভাবে কত বালাইনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। আশাকরি সচেতন কৃষক উপকৃত হবেন। সহযোগিতার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।❤️❤️